জীবিকার সন্ধানে দেশ ছেড়েছিলেন দুই তরুণ। স্বপ্ন ছিল পরিবারকে ভালো রাখার, সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কফিনবন্দি হয়ে ফিরলেন মাতৃভূমিতে। রোববার (৭ জুন) সকালে তাদের মরদেহ নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের বুকফাটা কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর সামনে অবশেষে ফিরে এলেন তারা, তবে জীবিত নয়, কফিনবন্দি নিথর দেহ হয়ে।
এর আগে শনিবার গভীর রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় তাদের মরদেহ। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। গত ১১ মে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতি অঞ্চলের জীবদিন এলাকায় নিজ বাসভবনে অবস্থানকালে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪০) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের নাহিদুল ইসলাম (২০)।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু জানান, বিমানবন্দরে সরকারের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে মরদেহ গ্রহণ করেন স্বজনরা। পরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। জোহরের নামাজ শেষে নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। দুই পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে শফিকুল ইসলামের পরিবার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানকে রেখে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
শফিকুলের বড় মেয়ে মৌ আক্তার বিজ্ঞান বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত করে গড়ে তোলা। সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, “শফিকুলের উপার্জনেই পুরো পরিবার চলত। তার মৃত্যুতে পরিবারটি চরম সংকটে পড়েছে। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও দুই মেয়ের লেখাপড়ার স্বার্থে সরকারের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন।”
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার, খুলনার সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. খালেদুর রহমান জানান, মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে দাফন-কাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়েছে। তিনি বলেন, বৈধভাবে বিদেশগামী কর্মী হওয়ায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে ৩ লাখ টাকা এবং জীবন বীমা বাবদ ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। ফলে শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলামের পরিবার নিয়ম অনুযায়ী মোট ১৩ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে।
তবে অর্থের অঙ্ক যত বড়ই হোক, দুই পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। যে মানুষগুলো পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তারা আজ কফিনবন্দি হয়ে ফিরলেন জন্মভূমিতে। তাদের মৃত্যুতে শুধু দুটি পরিবার নয়, শোকাহত পুরো সাতক্ষীরা। স্বজনদের চোখের জল আর অপূর্ণ স্বপ্নের ভার নিয়ে দুই রেমিট্যান্সযোদ্ধা চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন নিজ মাটিতে।
আজকের বাণী 






















