স্টাফ রিপোর্টার: একসময় সাতক্ষীরার গ্রামীণ জীবনে বাঁশ-বেতের তৈরি হাতপাখা, কুলা, ডালি, ঝুড়ি, চালুনি ও মাছ ধরার সরঞ্জাম ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ঘর-গৃহস্থালি থেকে কৃষিকাজ—সবখানেই এসব পণ্যের ব্যবহার ছিল। কিন্তু সস্তা ও সহজলভ্য প্লাস্টিকের পণ্যের দাপটে কমছে বাঁশের পণ্যের চাহিদা। সংকটে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প ও এর সঙ্গে জড়িত কারিগরদের জীবন-জীবিকা। দেবহাটা উপজেলার কোরাপাক্রাতলা গ্রামের সড়কের পাশে বাঁশের চিকন শলা দিয়ে ঝুড়ি তৈরি করছিলেন ৬৫ বছরের বেশি বয়সী বিশ্বনাথ দাস। তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেইক্যা এই কাম কইরা আসতেছি। এইডাই আমাগের ব্যবসা।’ একটি ঝুড়ি ১৫০ টাকায় বিক্রি করেন। এতে বাঁশ ও অন্যান্য খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সর্বোচ্চ দুটি ঝুড়ি বানাতে পারেন তিনি। প্রায় ৭০ বছর ধরে পরিবারে বাঁশের কাজ করছেন পঞ্চরঞ্জন দাস। তিনি বলেন, এখন আর আগের মতো লাভ নেই। কোনো রকমে সংসার চলে। অর্থাভাবে এক ছেলের পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে পারেননি। কোরাপাক্রাতলা গ্রামের কারিগর অরবিন্দ দাস কাঁকড়া ধরার আটন, ঢাকনা, চিংড়ি ধরার খোলুই, মাটির ঝুড়ি, কাবড়া ও কুলাসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন। তাঁর ভাষ্য, গ্রামে প্রায় ৫০ জন মানুষ বাঁশের কাজের সঙ্গে যুক্ত। কারিগর স্বপন দাস বলেন, একটি বাঁশ কিনতেই ১৫০ থেকে ২০০ টাকা লাগে। কিন্তু তৈরি পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত ঋণ ও সরকারি সহায়তা পেলে তাঁরা টিকে থাকতে পারবেন। দেবহাটা উপজেলা পরিষদের সামনের সড়কে ভ্যানে বাঁশের পণ্য বিক্রি করেন ৬০ বছরের বেশি বয়সী রবিন দাস। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এ ব্যবসায় যুক্ত। তিনি বলেন, একটি টাবরা ১৮০ টাকায় কিনে ২০০ টাকায় বিক্রি করেন। এই ব্যবসা দিয়েই সংসার চলে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর বাজারের বিক্রেতা কানাই কুমার বলেন, ব্যবসা শুরুর সময় প্লাস্টিকের ব্যবহার এত বেশি ছিল না। গত পাঁচ বছরে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাঁশের পণ্যের বাজার কমেছে। ২০২৪ সালে তাঁর প্রায় দুই লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বাজারে বিক্রি কমে যাওয়ায় তিনি এখন ভ্যানও চালান। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চিংড়ি, ফয়জুল্লাহপুর, দেবহাটার কাজীরহাট, বিষ্ণুপুর ও পারুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো বাঁশের পণ্য তৈরি হয়। তবে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকে পেশা বদল করছেন। নতুন প্রজন্মও এ কাজে আগ্রহ হারাচ্ছে। কালীগঞ্জের কারিগর মো. হোসাইন আলী বলেন, ‘বাপ-দাদার পেশা, তাই ধরে আছি। কিন্তু ছেলে-মেয়েরা আর এই কাজ করতে চায় না। পরিশ্রম বেশি, লাভ কম। চাহিদাও আগের মতো নেই।’ সাতক্ষীরা বিসিকের প্রচার কর্মকর্তা পীযূষ ঘোষ বলেন, জেলার অনেক মানুষ বাঁশ ও বেতের কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের জন্য প্রশিক্ষণ ও ঋণের সুযোগ রয়েছে। তবে সরকারি চাকরিজীবী জামিনদারের শর্ত থাকায় অনেক কারিগর ঋণ নিতে পারেন না। কারিগর ও ব্যবসায়ীদের দাবি, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বাজার সম্প্রসারণ, সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত না হলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
সংবাদ শিরোনাম:
বিজ্ঞাপন দিন
প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশের পণ্য
-
আজকের বাণী - আপডেট সময়: ১১:০৫:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ১২০ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস:
জনপ্রিয় সংবাদ



























