বাঙালির খাদ্যতালিকায় মাছ-ভাত প্রধান হলেও শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিন, আয়রন ও ভিটামিনের অন্যতম উৎস হলো লাল মাংস। তবে সাতক্ষীরার উপকূলীয় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিম্নবিত্ত ও দিনমজুর পরিবারের কাছে মাংস খাওয়া এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়সহ একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার বছরে শুধু কোরবানির সময়ই মাংসের স্বাদ পান।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ ও কমিউনিটি রিপোর্টে সাতক্ষীরা জেলার অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় গাবুরা ইউনিয়নে ১৫ হাজার ১৫৫টি পরিবারের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ২৯০টি পরিবার পাকা বা আধাপাকা ঘরে বসবাস করে। বাকি প্রায় ৯১ শতাংশ পরিবার কাঁচা ঘর বা ঝুপড়িতে বসবাস করছে, যা চরম দারিদ্র্যের ইঙ্গিত দেয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় আইলা, আম্ফান, ইয়াস, বুলবুল ও রিমালসহ বিভিন্ন দুর্যোগ এবং নদীভাঙনের কারণে উপকূলের বহু পরিবার জীবিকা হারিয়েছে। ফলে অনেক পরিবারের কোরবানি দেওয়ার সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গাবুরার ডুমুরিয়া এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, কোরবানির মাংস এখন সীমিত পরিমাণে পাওয়া যায়, যা দরিদ্র পরিবারের মধ্যে ভাগ করে নিতে হয়। তার ভাষায়, “এক পরিবারের ভাগে মাত্র অল্প পরিমাণ মাংস জোটে, যা সংরক্ষণ করার মতোও কিছু থাকে না।”
গাবুরা ও শ্যামনগর এলাকার অনেক পরিবারই ডাল, আলু ও শুঁটকি মাছের ওপর নির্ভর করে দৈনন্দিন খাবার চালাচ্ছেন। একই এলাকার বাসিন্দা আমেনা খাতুন বলেন, সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়, মাংস কেনা তাদের জন্য সম্ভব নয়। আরেক দিনমজুর লিয়াকত আলী জানান, সুন্দরবন থেকে জীবিকা আয়ের সুযোগও এখন কমে গেছে। ফলে পুষ্টিকর খাবার, বিশেষ করে লাল মাংস, তাদের কাছে স্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, কর্মসংস্থানের অভাব ও আয়হীনতা উপকূলীয় অঞ্চলের পুষ্টিহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শ্যামনগর ও গাবুরা অঞ্চলের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের বড় একটি অংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে।
তবে পুষ্টি বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফরহাদ জামিল বলেন, লাল মাংস শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয়রনের প্রধান উৎস। দীর্ঘদিন এটি না খেলে পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান মনে করেন, প্রোটিনের চাহিদা পূরণে শুধু লাল মাংসের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই। বিকল্প উৎস থেকেও পুষ্টি পাওয়া সম্ভব।
স্থানীয় উন্নয়নকর্মীরা বলছেন, নদী-উপকূলীয় এলাকায় কিছুটা মাছ পাওয়া গেলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে অনেক পরিবার এখনও আমিষ ও পুষ্টির ঘাটতিতে ভুগছে। গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জীবনমান ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে। তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচি জোরদারের আহ্বান জানান।
আজকের বাণী 






















