বাগেরহাটের হজরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজার শরীফের দিঘিতে থাকা কুমিরটিকে সরিয়ে আনা হয়েছে খুলনা বিভাগীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে। বুধবার (৩ জুন) দুপুরে মাজার শরীফের দিঘি থেকে বন অধিদফতরের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের একটি বিশেষজ্ঞ দল কুমিরটি ধরার পর গাড়িতে করে খুলনায় নিয়ে আসে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে কিছুদিন কুমিরটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর কুমিরটির নতুন ঠিকানা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রণী প্রজনন ও পর্যটন কেন্দ্রে পাঠানো হবে। মাজার শরিফে আগত দেশি-বিদেশী দর্শনার্থী পর্যটক, ভক্ত-আশেকানদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মঙ্গলবার রাত ১০টায় বাগেরহাটের জেলা প্রশাসন এক জরুরি সভার সিদ্ধান্ত বুধবার দুপুরেই কার্যকর করেছে বন বিভাগ। এর আগে রোববার (১ জুন) রাত সাড়ে ৮টার দিকে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজার শরীফের দিঘির মহিলা ঘাটে গোসল করতে নেমে ৭ বছর বয়সী শিশু ফাতেমা আক্তারকে টেনে নিয়ে যায় দিঘিতে থাকা একমাত্র কুমিরটি। প্রতিবন্ধী ভবঘুরে মায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে মাজার শরিফে থাকা ফাতেমার লাশ সোমবার সকালে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে মাজারের খাদেম ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। এর আগে গত ১০ এপ্রিল একই দিঘির প্রধান ঘাটে কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যায়। এসব ঘটনায় কুমিটিকে নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ শিশু ফাতেমার মৃত্যুর পর জনদাবির মুখে মাজার শরীফের দিঘি থেকে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করতে বুধবার সকাল থেকে খানজাহান আলী (রহ.) মাজার শরীফের দিঘিতে থাকা কুমিরটিকে ধরতে অভিযান চালায় বন বিভাগের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের একটি বিশেষজ্ঞ দল। দুপুর ১২টায় দেশব্যাপী আলোচিত মানুষখেকো এই কুমিরটিকে দিঘির পূর্ব পাড় থেকে ধরে বন বিভাগের প্রশিক্ষিত কর্মীরা।
দীঘির পাড়ে থাকা স্থানীয় এক নারী কুলসুম বেগম বলেন, খানজাহানের আমলে যে কুমির ছিল, তারা শান্ত ছিল। কিন্তু এই যে কুমিরটা, আমরা অনেক ভয় পাই। দীঘিতে নামতে পারি না এই কুমিরের ভয়ে। অনেক হিংস্র এই কুমিরটা। আগে যে ধলা পাহাড় কালা পাহাড় ছিল, তারা অনেক সভ্য ছিল। কুমির বিশেষজ্ঞ আজাদ কবির বলেন, আমরা ভালোভাবে কুমিরটিকে উদ্ধার করতে পেরেছি। প্রায় ৬০০ কেজি ওজন এই মাদী কুমিরটির। এটিকে এখন খুলনা রেসকিউ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কুমিরটি কোথায় অবমুক্ত করা হবে। বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. আতিয়া খাতুন বলেন, জননিরাপত্তার স্বার্থে মাজারের দিঘির কুমিরটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে প্রাণীটিকে। কুমিরের বিষয়ে পরবর্তীতে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তা আলোচনা সাপেক্ষে জানানো হবে। বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, মাজার শরীফ দিঘি থেকে কুমিরটি সরিয়ে নেয়ার কাজ বুধবার সকাল থেকে শুরু হয়। আমিসহ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের ডিএফও নির্মল কুমার পালসহ একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে কুমিরের খোঁজ শুরু করা হয়। দুপুর ১২টার দিকে কুমিরটিকে মাজার শরীফের দিঘির পূর্ব পাড় থেকে ধরা সম্ভব হয়। বন অধিদফতরের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের একটি বিশেষজ্ঞ দল কুমিরটিকে ধরার পরপরই গাড়িতে করে খুলনায় নিয়ে যায়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে কিছুদিন কুমিরটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর কুমিরটিকে প্রয়োজনে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রণী প্রজনন ও পর্যটন কেন্দ্রে পাঠানো হবে। উল্লেখ্য, বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজার দিঘির কুমিরকে ঘিরে রয়েছে দীর্ঘদিনের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও লোককথা। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর আগে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজার শরিফের সামনে প্রায় ৫৫ একর জায়গাজুড়ে দিঘি খননের পর দিঘির সুপেয় মিঠা পানি রক্ষার জন্য সেখানে এক জোড়া মিঠাপানি প্রজাতির কুমির ছেড়ে ছিলেন। পুরুষ কুমিরটির নাম রাখে ‘কালা পাহাড়’ ও স্ত্রী কুমিরটির নাম রাখে ‘ধলা পাহাড়’। পরবর্তী সময়ে তাদের বংশধরদেরও একই নামে ডাকা হতো।
তবে ওই সময়ের সর্বশেষ বংশধর কুমিরটির মৃত্যু হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এর আগে মাজার শরিফের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটি মিঠা পানি প্রজাতির কুমির এনে দিঘিতে ছাড়া হয়। এর মধ্যে কয়েকটি মারা যায়। সর্বশেষ দু’টি কুমিরের একটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যাওয়ার পর বর্তমানে দিঘিতে মাত্র একটি কুমিরই রয়েছে। বর্তমান এই কুমিরটি মাজার শরীফের দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে অবসান হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর ইতিহাস-ঐতিহ্য। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন জানিয়েছেন, মাজার শরীফ দিঘির দু’টি ঘাটে নিরাপত্তা বলায় তৈরি না করা পর্যন্ত কুমিরটিকে প্রথমে খুলনা নেওয়া হয়েছে। পরে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রণী প্রজনন ও পর্যটন কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হবে। দিঘির দু’টি ঘাট এলাকায় ফেন্সিং দেওয়ার পর কুমিরটিকে আবার হজরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজার শরীফের দিঘিতে ফিরিয়ে আনা হবে।
আজকের বাণী 





















