তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং ডিজেল সংকটে সাতক্ষীরার কৃষি অর্থনীতিতে বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। একদিকে প্রচণ্ড দাবদাহ, অন্যদিকে সেচ সংকটে ফসলের মাঠ রোদে পুড়ে চৌচির হওয়ার উপক্রম। তাই শেষ মুহূর্তে এসে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাতক্ষীরার কয়েক হাজার কৃষক। সাতক্ষীরার দিগন্তজোড়া মাঠে এখন সোনালী স্বপ্নের হাতছানি। ইরি-বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে ধানের শীষে দুধল দানা কেবল পুষ্ট হতে শুরু করেছে। এই সময়ে ফসলের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সেচ। কিন্তু সারাদেশের মতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই কৃষি প্রধান এই জেলায় জেঁকে বসেছে তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং ডিজেল সংকট। সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো: সাইফুল ইসলাম জানান, চলতি বোরো মৌসুমে সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে চাষ হয়েছে ৮২ হাজার ৬৭৩ হেক্টর জমিতে। এসব জমিতে সেচ দেয়ার জন্য বিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্প রয়েছে সাত হাজার ৪০টি এবং ডিজেলচালিত সেচ পাম্প রয়েছে ৪৮ হাজার ৮৬০টি। মৌসুমের শেষ পর্যন্ত এসব ডিজেলচালিত সেচ পাম্প পরিচালনার জন্য ৩৮ লাখ ৪৭ হাজার ৭২৫ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। ইতিমধ্যে কিছু উপজেলায় ৫ শতাংশ ফসল কাটা হয়ে গেছে। তবে বেশিরভাগ উপজেলায় এখনো দশ-পনের দিন পরে ধান কাটা শুরু হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ধানে এখনো দুই-একটি সেচের প্রয়োজন হবে। তবে আশা করছি, কৃষিতে সেচের সমস্যা হবে না। বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং সমস্যার প্রভাব ফসলে পড়বে না।’ তবে সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেলো তাদের কৃষকদের দাবি ভিন্ন। তারা বলছেন, ‘প্রায় এক মাস ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে ভালভাবে সেচ দিতে পারিনি। সর্বশেষ দুই সপ্তাহ ধরে দিনে ও রাতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ১০-১২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে গভীর রাতে যখন সেচ পাম্পগুলো চালানোর কথা, তখনই দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ থাকছে না গ্রামাঞ্চলে। ফলে ফসলে এবার মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছি। ’ তালা উপজেলার কৃষক সমির আক্ষেপ করে বলেন, ‘ধানের শীষ কেবল বের হইছে। এই সময় মাটি শুকায়ে গেলে চাল হবে না, সব চিটা হয়ে যাবে। সারারাত পাম্পের গোড়ায় বসে থাকি বিদ্যুতের আশায়, কিন্তু দেখা নাই। যখন আসে, তখন ভোল্টেজ এতো কম যে পানি ঠিকমতো উঠে না।’ সাতক্ষীরা পৌনসভা এলাকার কৃষক ও পানি ব্যবসায়ী সুরাত আলী বলেন, ‘আমার একটি গভীর নলকূপ আছে। কিন্তু বিদ্যুৎ তো আসে আর যায়! ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাও ঠিকমতো বিদ্যুৎ থাকে না। যখন আসে, তখন ভোল্টেজ এতো কম থাকে যে মোটরের কয়েল পুড়ে যাওয়ার ভয়ে পাম্প ছাড়তে পারি না।’ ‘মাঠের কৃষকরা পানির জন্য প্রতিদিন আমার বাড়িতে এসে ভিড় করছে, গালিগালাজ করছে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে আমি পানি দেবো কোত্থেকে? অনেকটা ক্ষুব্ধভাবেই বললেন হাবিবুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যুতের অভাবে পাম্প না চললেও মাস শেষে ঠিকই বড় অঙ্কের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ডিজেল দিয়ে পাম্প চালাতে গেলে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে, যা কৃষকরা দিতে রাজি নন। এই অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক লাখ টাকা লোকসান দিয়ে তাকে পানি ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। এ যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা। একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষকরা বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের দিকে ঝুঁকলেও সেখানেও বিপত্তি বাঁধে। বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে সাতক্ষীরার স্থানীয় বাজারগুলোতে ডিজেলের তীব্র সংকট রয়েছে। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দিয়েও চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না চাষীরা। অনেকে বাধ্য হয়ে ড্রামপ্রতি চড়া দাম দিয়ে কালোবাজার থেকে তেল কিনছেন। জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, ‘তেল নাই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। কিছু কিছু পাম্পে বিশেষ ব্যবস্থা থাকলেও কৃষকদের দীর্ঘ লাইনের কারণে মিলছে না কাক্সিক্ষত পরিমান জ্বালানি। বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ঘাটতির অজুহাত দেখাচ্ছেন পাম্প মালিকরা। প্রতি লিটার ডিজেলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি দিয়ে প্রান্তিক কৃষকদের অনেক সময় জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কায় ভুগছেন তারা। এ বছর এপ্রিলের শুরু থেকেই সাতক্ষীরার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি হওয়ায় মাঠের পানি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বোরো ধানের এই পর্যায়ে জমিতে পরিমান মতো পানি না থাকলে ধানের দানা পুষ্ট হবে না এবং ‘হিট শক’-এর কারণে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মুহাঃ আজিজুর রহমান সরকার বলেন, ‘বর্তমান কৃষকদের সেচ চাহিদার বিপরীতে আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে দিতে পারছিনা। রেশনিং পদ্ধতিতে লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে।’তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। বিদ্যুৎ বিভাগকে সেচ কাজে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা রোদ কম থাকলে অর্থাৎ বিকেলে বা ভোরে সেচ দেন। তবে জ্বালানি ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকটে কৃষকরা যে চাপে আছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।’ কর্মকর্তাদের দাবি, গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। ফলে রেশনিং করে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, সেচ মৌসুমে কৃষি ফিডারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। সাতক্ষীরা জেলা দেশের অন্যতম শস্যভাণ্ডার। এখান থেকে উৎপাদিত ধান দেশের একটি বড় অংশের চালের চাহিদা মেটায়। কিন্তু মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে জ্বালানি আর বিদ্যুতের এই হাহাকার কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কৃষকদের দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বন্ধ করতে হবে এবং ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মাঠের পাকা ধানের বদলে কেবল খড় নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে তাদের। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কৃষি নির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।
সংবাদ শিরোনাম:
বিজ্ঞাপন দিন
সাতক্ষীরার কৃষি অর্থনীতিতে বিপর্যয়ের শঙ্কা
-
রিপোর্টার - আপডেট সময়: ০৯:৫৪:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
- ২৩ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস:
জনপ্রিয় সংবাদ























