আজ বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন দিন
জাতীয়, আঞ্চলিক, স্থানীয় পত্রিকাসহ অনলাইন পোর্টালে যে কোন ধরনের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন। মেসার্স রুকাইয়া এড ফার্ম 01711-211241, 01971 211241

বাঘ-দস্যুর ভয় উপেক্ষা করে সুন্দরবনের মধু সংগ্রাহকরা

  • রিপোর্টার
  • আপডেট সময়: ০৮:৫৮:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬
  • ৩৮ বার পড়া হয়েছে

জীবনের ঝুঁকি যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। তবু পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতি বছরই সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে পা রাখেন উপকূলের হাজারো মৌয়াল। বাঘের ভয়, দস্যুর আতঙ্ক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবকিছুকে উপেক্ষা করে তারা সংগ্রহ করেন খাঁটি প্রাকৃতিক মধু। বন বিভাগ চলতি বছর এপ্রিল থেকে দুই মাস মধু আহরণের অনুমতি দিয়েছে। পারমিট নিয়ে দলবদ্ধভাবে বনে প্রবেশ করছেন মৌয়ালরা। প্রতিটি দলে সাধারণত ৮–১২ জন সদস্য থাকে। ছোট নৌকা দিয়ে নদী পাড়ি দিয়ে বনের গভীরে পৌঁছান তারা। সাথে থাকে খাদ্য, জ্বালানি, দা, দড়ি ও ধোঁয়া তৈরির সরঞ্জাম। কখনও কখনও ১৫–২০ দিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতেও হয়। মধু আহরণের প্রক্রিয়া ঝুঁকিপূর্ণ। অভিজ্ঞ মৌয়ালরা প্রথমে গাছের উঁচু ডালে ঝুলে থাকা মৌচাক শনাক্ত করেন। শুকনো পাতা বা ঘাস জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে মৌমাছিদের শান্ত করা হয়। একজন মৌয়াল দড়ি বেয়ে গাছে উঠে চাক কেটে নিচে নামিয়ে দেন। নিচে থাকা সদস্যরা তা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করেন। একটি বড় মৌচাক থেকে কয়েক কেজি মধু পাওয়া যায়। সুন্দরবন মানেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার। যে কোনো সময় বাঘের মুখোমুখি হওয়ার ভয় থাকে মৌয়ালদের।

প্রতি বছর বাঘের আক্রমণে হতাহতের ঘটনা ঘটে। নদীতে কুমির, জঙ্গলে বিষধর সাপ, হঠাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বনদস্যুর উৎপাত—সবই তাদের জীবনের ঝুঁকি বাড়ায়। মৌয়ালরা প্রাকৃতিক বিপদ এড়াতে ধর্মীয়ভাবে প্রস্তুতি নেন। কেউ কেউ বনবিবির কাছে দোয়া করেন, যেন বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পান। শ্যামনগরের মৌয়াল আব্দুল করিম বলেন, “আমরা জানি বনে গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি আছে, কিন্তু না গেলে সংসার চলে না। তাই বাধ্য হয়ে যাই।” হাবিবুর রহমান যোগ করেন, “এক মৌসুমে যা আয় হয়, তা দিয়েই সারা বছর সংসার চলে। অনেক সহকর্মীকে হারিয়েছি, তবু জীবিকার তাগিদে আবারও যেতে হয়।” সুন্দরবনের মধু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হয়। খাঁটি হওয়ায় চাহিদা বেশি। বিদেশেও রপ্তানি হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপকূলীয় অঞ্চলের বহু পরিবার এই মধু সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। তবে মৌয়ালরা নিরাপত্তা জোরদার করার আহ্বান জানাচ্ছেন। বিশেষ করে বাঘের আক্রমণ প্রতিরোধ, দস্যু দমন এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। ঝুঁকি, ভয় ও অনিশ্চয়তার মাঝেই চলে মৌয়ালদের জীবন সংগ্রাম। প্রতিটি দিন তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। তবু জীবন থেমে থাকে না—বাঘ ও দস্যুর আতঙ্ক উপেক্ষা করেই এগিয়ে চলে সুন্দরবনের মধু সংগ্রহ কার্যক্রম।

ট্যাগস:

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখকের তথ্য সম্পর্কে

জনপ্রিয় সংবাদ

বাঘ-দস্যুর ভয় উপেক্ষা করে সুন্দরবনের মধু সংগ্রাহকরা

আপডেট সময়: ০৮:৫৮:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬

জীবনের ঝুঁকি যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। তবু পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতি বছরই সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে পা রাখেন উপকূলের হাজারো মৌয়াল। বাঘের ভয়, দস্যুর আতঙ্ক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবকিছুকে উপেক্ষা করে তারা সংগ্রহ করেন খাঁটি প্রাকৃতিক মধু। বন বিভাগ চলতি বছর এপ্রিল থেকে দুই মাস মধু আহরণের অনুমতি দিয়েছে। পারমিট নিয়ে দলবদ্ধভাবে বনে প্রবেশ করছেন মৌয়ালরা। প্রতিটি দলে সাধারণত ৮–১২ জন সদস্য থাকে। ছোট নৌকা দিয়ে নদী পাড়ি দিয়ে বনের গভীরে পৌঁছান তারা। সাথে থাকে খাদ্য, জ্বালানি, দা, দড়ি ও ধোঁয়া তৈরির সরঞ্জাম। কখনও কখনও ১৫–২০ দিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতেও হয়। মধু আহরণের প্রক্রিয়া ঝুঁকিপূর্ণ। অভিজ্ঞ মৌয়ালরা প্রথমে গাছের উঁচু ডালে ঝুলে থাকা মৌচাক শনাক্ত করেন। শুকনো পাতা বা ঘাস জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে মৌমাছিদের শান্ত করা হয়। একজন মৌয়াল দড়ি বেয়ে গাছে উঠে চাক কেটে নিচে নামিয়ে দেন। নিচে থাকা সদস্যরা তা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করেন। একটি বড় মৌচাক থেকে কয়েক কেজি মধু পাওয়া যায়। সুন্দরবন মানেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার। যে কোনো সময় বাঘের মুখোমুখি হওয়ার ভয় থাকে মৌয়ালদের।

প্রতি বছর বাঘের আক্রমণে হতাহতের ঘটনা ঘটে। নদীতে কুমির, জঙ্গলে বিষধর সাপ, হঠাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বনদস্যুর উৎপাত—সবই তাদের জীবনের ঝুঁকি বাড়ায়। মৌয়ালরা প্রাকৃতিক বিপদ এড়াতে ধর্মীয়ভাবে প্রস্তুতি নেন। কেউ কেউ বনবিবির কাছে দোয়া করেন, যেন বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পান। শ্যামনগরের মৌয়াল আব্দুল করিম বলেন, “আমরা জানি বনে গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি আছে, কিন্তু না গেলে সংসার চলে না। তাই বাধ্য হয়ে যাই।” হাবিবুর রহমান যোগ করেন, “এক মৌসুমে যা আয় হয়, তা দিয়েই সারা বছর সংসার চলে। অনেক সহকর্মীকে হারিয়েছি, তবু জীবিকার তাগিদে আবারও যেতে হয়।” সুন্দরবনের মধু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হয়। খাঁটি হওয়ায় চাহিদা বেশি। বিদেশেও রপ্তানি হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপকূলীয় অঞ্চলের বহু পরিবার এই মধু সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। তবে মৌয়ালরা নিরাপত্তা জোরদার করার আহ্বান জানাচ্ছেন। বিশেষ করে বাঘের আক্রমণ প্রতিরোধ, দস্যু দমন এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। ঝুঁকি, ভয় ও অনিশ্চয়তার মাঝেই চলে মৌয়ালদের জীবন সংগ্রাম। প্রতিটি দিন তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। তবু জীবন থেমে থাকে না—বাঘ ও দস্যুর আতঙ্ক উপেক্ষা করেই এগিয়ে চলে সুন্দরবনের মধু সংগ্রহ কার্যক্রম।