শারীরিক অসুস্থতার কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন তারা। চিকিৎসা শেষে প্রিয়জনদের কাছে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু কলকাতার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সেই যাত্রা পরিণত হয়েছে মৃত্যুর ঘটনায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের (ফ্রি স্কুল স্ট্রিট) ১৫ এইচ নম্বরের পাঁচতলা ভবনের ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুনে দুই শিশু ও এক নারীসহ ৯ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি ও একজন ভারতের ঝাড়খণ্ডের নাগরিক। বাকি তিনজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি।
গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাত পৌনে দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে ভবনের তৃতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, একটি এয়ার কন্ডিশনার (এসি) থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আগেই ঘন কালো ধোঁয়ায় পুরো ভবন ঢেকে যায়। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, নিহতদের শরীরে বড় ধরনের পোড়ার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়েই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আতঙ্কিত বাসিন্দারা ধোঁয়া থেকে বাঁচতে বাথরুমে আশ্রয় নেন। পরে ফায়ার সার্ভিস মই দিয়ে জানালা ও বারান্দা থেকে আটকে পড়াদের উদ্ধার করে।
উদ্ধারকারীরা প্রায় ৮০ জনকে জীবিত উদ্ধার করেন। আহত ছয় বাংলাদেশিকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
নিহত পাঁচ বাংলাদেশির মধ্যে চারজন কুষ্টিয়ার একই পরিবারের সদস্য। তাঁরা হলেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আরুয়াপাড়ার দেবাশিস দত্ত (৩৭), তাঁর স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৫), তাঁদের শিশুপুত্র শর্ণশিষ দত্ত এবং দেবাশিসের শ্বশুর মো. আকরাম আলী (৬৪)। নিহত আরেক বাংলাদেশি ঢাকার সাভারের বেগুনবাড়ি এলাকার আহমেদ বাবু। নিহতদের মধ্যে ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার ১৯ বছর বয়সী সন্দীপ পাসওয়ানের পরিচয়ও নিশ্চিত হয়েছে।
দেবাশিস দত্ত দৈনিক ‘আজকের আলো’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ‘আজকের পত্রিকা’ ও ‘চ্যানেল নাইন’-এর জেলা প্রতিনিধি এবং কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ভারতে যান দেবাশিস। কলকাতায় চিকিৎসার পর তাঁরা বেঙ্গালুরু যান। চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার রাতে বিমানে কলকাতায় ফেরেন। পরদিন তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল। ভারতে অবস্থানকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত ছবি ও ভ্রমণের তথ্য প্রকাশ করছিলেন দেবাশিস। মৃত্যুর কিছু সময় আগে দেওয়া তাঁর শেষ পোস্টে ছিল—‘টানা ১৩ দিন পর বেঙ্গালুরু বাই বাই…’। সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর শেষ পোস্ট।
দেবাশিসের আট বছর বয়সী বড় মেয়ে মহিমা দত্ত (পাখি) কুষ্টিয়ায় থাকায় প্রাণে বেঁচে যায়। এক রাতেই সে বাবা, মা ও ছোট ভাইকে হারিয়েছে।
ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে দেবাশিসের মা স্বপ্না দত্ত বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। কালকেও তো ভালো মানুষটা আমার সঙ্গে কথা বলল!’
দেবাশিসের বাবা দিলীপ দত্ত বলেন, ‘একজন বাবা হয়ে কীভাবে সন্তানের লাশ মেনে নেব?’
দিলীপ দত্ত জানান, ৩ আগস্ট স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ভারতে যান দেবাশিস। দুই দিন পর তাঁর শ্বশুরও কলকাতায় যান। পরে চিকিৎসার জন্য তাঁরা বেঙ্গালুরু যান। সোমবার রাতে কলকাতায় ফিরে ওই হোটেলে ওঠেন। পরদিন দেশে ফেরার কথা ছিল।
দেবাশিসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর বাড়িতে স্বজন, সাংবাদিক ও প্রতিবেশীরা ভিড় করেন। মা স্বপ্না দত্ত কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমার দেবা একটু পরই বাড়িতে আসবে। এত দেরি করছে কেন?’
সাংবাদিক দেবাশিস দত্ত ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুতে আজকের পত্রিকা পরিবার শোক জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে পত্রিকাটি বলেছে, এই অকালমৃত্যু তাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে।
কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’ কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু মনি জুবায়েদ রিপন বলেন, দেবাশিসের মৃত্যু কুষ্টিয়ার সাংবাদিকতার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
এদিকে কলকাতার হোটেলে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। বুধবার (১৯ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন বিষয়টি দেখভাল করছে। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং তথ্য সহায়তার জন্য ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষে মরদেহ দেশে আনার খরচ বহন করা সম্ভব না হলে সরকার তা বহন করবে বলেও জানান তিনি।
কলকাতা পুলিশ জানিয়েছে, হোটেলটিতে অগ্নিনিরাপত্তার মৌলিক ব্যবস্থা ছিল না। আবাসিক ব্যবহারের ভবনটিতে অবৈধভাবে বাণিজ্যিক গেস্টহাউস পরিচালনা করা হচ্ছিল। ভবনটির মূল পিলার কেটে কাঠামোগত পরিবর্তন করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। চলাচলের জন্য ছিল একটি সরু পথ। জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা না থাকায় ধোঁয়ায় সিঁড়ি বন্ধ হয়ে গেলে বাসিন্দারা আটকা পড়েন।
পুলিশের দাবি, প্রয়োজনীয় ফায়ার সেফটি ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে হোটেলটি চলছিল। এ ঘটনায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর মামলা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেল মালিক ও কর্মচারীরা পলাতক রয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
আজকের বাণী 



























