আজ বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন দিন
জাতীয়, আঞ্চলিক, স্থানীয় পত্রিকাসহ অনলাইন পোর্টালে যে কোন ধরনের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন। মেসার্স রুকাইয়া এড ফার্ম 01711-211241, 01971 211241

দেয়াল ভাঙার গল্প: নোনা মাটির চর গাবুরার মাঠে মেয়েদের নীরব বিপ্লব

  • রিপোর্টার
  • আপডেট সময়: ১০:৪০:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫
  • ১৫৬ বার পড়া হয়েছে
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার একেবারে প্রান্তে অবস্থিত গাবুরা ইউনিয়ন-যে এলাকা লবণাক্ত মাটি, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতচিহ্ন আর নাজুক জীবিকার জন্য পরিচিত- সেখানে ঘটছে এক নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তন। বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের মেয়েরা ঘরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। সমাজের অলিখিত নিয়ম যেন বলত, “মেয়ের স্থান ঘরের ভেতরেই।”
খেলাধুলার মাঠে পা রাখা ছিল তাদের কাছে প্রায় নিষিদ্ধ এক স্বপ্ন। “মেয়ে মানুষ আবার খেলবে?”-এমন প্রশ্নে থেমে যেত অনেক কিশোরীর ইচ্ছা। পরপর ঘূর্ণিঝড়ে বহু ছেলেরা কাজের খোঁজে বাইরে চলে গেলেও, মেয়েরা রয়ে গেছে ঘরের কাজে, সীমাবদ্ধতায়, নিজের স্বপ্ন থেকে দূরে।
কিন্তু এখন সেই চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। স্পিরিট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স নামের সংস্থা। এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান তের দে জোম ফাউন্ডেশন অর্থায়ন করছে এসডিসি এবং অলিম্পিক রিফিউজি ফাউন্ডেশন।
নিয়মিত ক্রীড়া কার্যক্রম, নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির মাধ্যমে ‘স্পিরিট’ প্রকল্প শেখাচ্ছে-নিজের চার দেয়ালের বাইরেও রয়েছে এক উন্মুক্ত পৃথিবী।
রবিবার (২ নভেম্বর) গাবুরার জি.এল.এম. সেকেন্ডারি স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ইউনিয়ন পর্যায়ের ক্রীড়া উৎসব। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে দিনটি পরিণত হয় উৎসবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক ফিফা রেফারি ও জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত তাওয়েব হাসান সামছুজ্জামান বাবু। তিনি বলেন, “যারা মাঠে খেলতে শেখে, তারা জীবনের খেলায়ও হার মানে না। ‘স্পিরিট’ মেয়েদের ভয় ভাঙতে সাহায্য করেছে, আত্মবিশ্বাস আর পরিচয়ের বোধ গড়ে তুলেছে। এই পরিবর্তন যেন চলতে থাকে।”
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা ক্রিকেট কোচ মুফাদিমুল ইসলাম, ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. শরিফুল ইসলাম, উপজেলা কো-অর্ডিনেটর মো. মিনহাজ শাহরিয়ারসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
ছেলেদের বন্ধুত্বপূর্ণ ফুটবল ম্যাচে ছিল প্রতিযোগিতার উত্তাপ, আর মেয়েদের খেলায় ছিল আত্মপ্রকাশের সাহস, আবেগ ও দৃঢ়তা। যে মেয়েরা একসময় জনসমক্ষে আসতেও দ্বিধাবোধ করত, তারাই এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে দলকে, গোল দিচ্ছে, আর মাঠ জুড়ে বাজছে অভিভাবক ও শিক্ষকদের করতালি।
দিনব্যাপী আয়োজনে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খেলা—হারি ভাঙা, বালিশ নিক্ষেপ ও চামচ দৌড়।
বক্তারা বলেন, “গাবুরার মেয়েরা প্রমাণ করেছে- সংকল্প থাকলে কোনো বাধাই অটল থাকে না। ‘স্পিরিট’ শুধু খেলাধুলার সুযোগই দেয়নি, দিয়েছে নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক পরিবর্তনের পথ।”
আজ সেই মেয়েরাই হয়ে উঠছে অনুপ্রেরণার প্রতীক-জলবায়ু সচেতনতা, নিরাপত্তা ও নেতৃত্বমূলক কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে সক্রিয়ভাবে।
গাবুরার মাঠ আজ আর নীরব নয়। এখানে ফুটছে মেয়েদের সাহস, আশার আলো আর নীরব এক বিপ্লবের গল্প-যারা স্বপ্ন দেখতে শিখেছে, তারাই ভবিষ্যত বদলে দিচ্ছে।
ট্যাগস:

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লেখকের তথ্য সম্পর্কে

জনপ্রিয় সংবাদ

দেয়াল ভাঙার গল্প: নোনা মাটির চর গাবুরার মাঠে মেয়েদের নীরব বিপ্লব

আপডেট সময়: ১০:৪০:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার একেবারে প্রান্তে অবস্থিত গাবুরা ইউনিয়ন-যে এলাকা লবণাক্ত মাটি, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতচিহ্ন আর নাজুক জীবিকার জন্য পরিচিত- সেখানে ঘটছে এক নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তন। বহু বছর ধরে এই অঞ্চলের মেয়েরা ঘরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। সমাজের অলিখিত নিয়ম যেন বলত, “মেয়ের স্থান ঘরের ভেতরেই।”
খেলাধুলার মাঠে পা রাখা ছিল তাদের কাছে প্রায় নিষিদ্ধ এক স্বপ্ন। “মেয়ে মানুষ আবার খেলবে?”-এমন প্রশ্নে থেমে যেত অনেক কিশোরীর ইচ্ছা। পরপর ঘূর্ণিঝড়ে বহু ছেলেরা কাজের খোঁজে বাইরে চলে গেলেও, মেয়েরা রয়ে গেছে ঘরের কাজে, সীমাবদ্ধতায়, নিজের স্বপ্ন থেকে দূরে।
কিন্তু এখন সেই চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। স্পিরিট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স নামের সংস্থা। এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান তের দে জোম ফাউন্ডেশন অর্থায়ন করছে এসডিসি এবং অলিম্পিক রিফিউজি ফাউন্ডেশন।
নিয়মিত ক্রীড়া কার্যক্রম, নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির মাধ্যমে ‘স্পিরিট’ প্রকল্প শেখাচ্ছে-নিজের চার দেয়ালের বাইরেও রয়েছে এক উন্মুক্ত পৃথিবী।
রবিবার (২ নভেম্বর) গাবুরার জি.এল.এম. সেকেন্ডারি স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ইউনিয়ন পর্যায়ের ক্রীড়া উৎসব। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে দিনটি পরিণত হয় উৎসবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক ফিফা রেফারি ও জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত তাওয়েব হাসান সামছুজ্জামান বাবু। তিনি বলেন, “যারা মাঠে খেলতে শেখে, তারা জীবনের খেলায়ও হার মানে না। ‘স্পিরিট’ মেয়েদের ভয় ভাঙতে সাহায্য করেছে, আত্মবিশ্বাস আর পরিচয়ের বোধ গড়ে তুলেছে। এই পরিবর্তন যেন চলতে থাকে।”
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা ক্রিকেট কোচ মুফাদিমুল ইসলাম, ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. শরিফুল ইসলাম, উপজেলা কো-অর্ডিনেটর মো. মিনহাজ শাহরিয়ারসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
ছেলেদের বন্ধুত্বপূর্ণ ফুটবল ম্যাচে ছিল প্রতিযোগিতার উত্তাপ, আর মেয়েদের খেলায় ছিল আত্মপ্রকাশের সাহস, আবেগ ও দৃঢ়তা। যে মেয়েরা একসময় জনসমক্ষে আসতেও দ্বিধাবোধ করত, তারাই এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে দলকে, গোল দিচ্ছে, আর মাঠ জুড়ে বাজছে অভিভাবক ও শিক্ষকদের করতালি।
দিনব্যাপী আয়োজনে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খেলা—হারি ভাঙা, বালিশ নিক্ষেপ ও চামচ দৌড়।
বক্তারা বলেন, “গাবুরার মেয়েরা প্রমাণ করেছে- সংকল্প থাকলে কোনো বাধাই অটল থাকে না। ‘স্পিরিট’ শুধু খেলাধুলার সুযোগই দেয়নি, দিয়েছে নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক পরিবর্তনের পথ।”
আজ সেই মেয়েরাই হয়ে উঠছে অনুপ্রেরণার প্রতীক-জলবায়ু সচেতনতা, নিরাপত্তা ও নেতৃত্বমূলক কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে সক্রিয়ভাবে।
গাবুরার মাঠ আজ আর নীরব নয়। এখানে ফুটছে মেয়েদের সাহস, আশার আলো আর নীরব এক বিপ্লবের গল্প-যারা স্বপ্ন দেখতে শিখেছে, তারাই ভবিষ্যত বদলে দিচ্ছে।