বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। অথচ এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ও দাতা সংস্থাগুলোর বরাদ্দ তহবিল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অঢেল অনিয়ম ও দুর্নীতির মহোৎসব। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)সহ একাধিক সংস্থার গবেষণা ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে এর প্রমাণ মিলেছে বারবার।
টিআইবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোনো জলবায়ু প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া তহবিল থেকে সরকারি কর্মকর্তা, প্রভাবশালী মহল ও কিছু এনজিও বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এনজিওগুলোকে প্রকল্পের অর্থ পেতে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
দেশে জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প বাস্তবায়নে বরগুনা, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালীর প্রকল্পগুলোতে ১৪ থেকে ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। ৬৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে গবেষণায়। সাতক্ষীরা অঞ্চলের প্রকল্পগুলোতেই সবচেয়ে বেশি অর্থ লুটপাটের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
জলবায়ু অভিযোজন খাতে অর্থ বরাদ্দের একটি বড় অংশ বৈদেশিক ঋণ থেকে আসে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপর ঋণের বোঝা হয়ে পড়ে। গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ জানিয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতি নাগরিকের মাথাপিছু জলবায়ু ঋণ ৭৯ দশমিক ৬ মার্কিন ডলার।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আসেন পরিবেশবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। শুরুতে আশা করা হয়েছিল, জলবায়ু প্রকল্পে অতীতের লুটপাটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো বিশেষ কমিটি গঠন বা অনুসন্ধানমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শীর্ষকাগজ ও শীর্ষনিউজ ডটকমকে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্যও সরবরাহ করা হয়নি।
বায়ুদূষণ রোধে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক তহবিল পাওয়ার পরও দেশের বায়ুর মান বছরের অর্ধেক সময়ই মারাত্মক পর্যায়ে থাকে। ৮০২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ’ প্রকল্পের কোনো ইতিবাচক ফল আসেনি। বরং তহবিলের অপচয় ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে।
টিআইবির আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি কার্যক্রম অত্যন্ত দুর্বল। শতকরা ৫১ ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তীর্ণ ছাড়পত্রে চলছে, ৭২ শতাংশ অবৈধভাবে আবাসিক এলাকায় স্থাপিত। পরিবেশ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা ঘুষ ও অবৈধ প্রভাবের মাধ্যমে দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে জড়িত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু খাতে টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য অনিয়মে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, তদারকি জোরদার এবং প্রভাবমুক্তভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
রিপোর্টার 




























